মৈত্রেয়নাথ- প্রথম বিজ্ঞানবাদ প্রচার করেন। তাঁর শিষ্য অসঙ্গ মৈত্রেয়নাথ রচিত ছন্দোবদ্ধ কারিকাগুলির ব্যাখ্যা করে গ্রন্থ রচনা করেন। অসঙ্গ রচিত মহাযান সূত্রালঙ্কার যোগাচার দর্শনের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তিনি
তাঁর মতবাদকে ‘যোগাচার’ বলে অভিহিত করেন। যোগ ও আচার দুটিকেই গ্রহণ করায় এই মতবাদ ‘যোগাচার’ বলে পরিচিত। যোগ হল অজ্ঞাত বা অপ্রাপ্ত বিষয়কে জানার জন্য প্রশ্ন বা অনুসন্ধান এবং আচার হল বুদ্ধের উপদিষ্ট তত্ত্বকে গ্রহণ। আবার বোধিসত্ত্ব অবস্থায় সমস্ত দশভূমি অতিক্রম করে বোধি বা পরমার্থ সত্য লাভ হলে বুদ্ধত্ব লাভ সম্ভব এবং একমাত্র যোগের আচরণ অর্থাৎ যোগ সাধনার দ্বারাই বোধি লাভ সম্ভব-এই সিদ্ধান্তের জন্যও এই মতবাদকে ‘যোগাচার’ বলা হয়।
অসঙ্গের ভাই বসুবন্ধু এই মতবাদকে ‘বিজ্ঞানবাদ’ বলেছেন। অসঙ্গের পর বিজ্ঞানবাদের প্রবক্তারা হলেন, বসুবন্ধু, দিঙনাগ, ধর্মকীর্তি এবং শান্তরক্ষিত। বসুবন্ধু, দিনাগ, ধর্মকীর্তি প্রভৃতি বৌদ্ধাচার্যগণ নানা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে বিজ্ঞানের
অতিরিক্ত ব্যহ্যবস্তু অসৎ। তাঁদের মতে জ্ঞানগ্রাহ্য বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব যুক্তির দ্বারা সিদ্ধ হয় না। তাঁদের যুক্তিগুলি নিম্নরূপ:
(১) বিজ্ঞানই একমাত্র পরমার্থসৎ। তদতিরিক্ত কোন বস্তুর সত্তা নাই। বিজ্ঞান ক্ষনিক। বিজ্ঞান প্রথমক্ষণে উৎপন্ন হয়ে দ্বিতীয় ক্ষণেই বিনষ্ট হয়ে যায়। আমরা ঘট, পট যে সব বাহ্যবস্তু দেখি কিংবা হর্ষ, বিবাদ যেসব আস্তর বস্তু উপলব্ধি করি, তাদের পারমার্থিক সত্তা নাই। ঐ সব বাহ্য ও আস্তর বস্তু বিজ্ঞানের পরিনাম। বিজ্ঞানই ঘটপটাদি বাহ্যবস্তু রূপে প্রতীয়মান হয়। সুতরাং ঘটপটাদি ও বিজ্ঞান অভিন্ন। স্বপ্ন স্থলে যেরূপ বিজ্ঞান বিষয়ের সত্তাকে অপেক্ষা করে না সেরূপ জাগরনস্থলে ও বিজ্ঞান বিষয়ের স্বপ্ন স্থলে যেরূপ বিজ্ঞান বিষয়ের সত্তাকে অপেক্ষা করে না সেরূপ জাগরনস্থলে ও বিজ্ঞান বিষয়ের সত্তাকে অপেক্ষা করে না। সুতরাং স্বীকার করতে হয় যে, স্বপ্নাদিস্থলের মত জাগরনে ও বিজ্ঞানেরই সত্তা সিদ্ধ হয়, বিষয়ের পৃথক সত্তা সিদ্ধ হয় না।
(২) বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না, যেহেতু বাহ্যবস্তু যে জ্ঞান থেকে বিভিন্ন তা দেখান যায় না। ধর্মকীর্তি বলেন, জ্ঞান ও জ্ঞানের বিষয় অভিন্ন। জ্ঞান ও বিষয়ের যে ভেদ আমরা অনুভব করি, তা মিথ্যা। যে বিষয় যে জ্ঞানের দ্বারা জানা যায়, তা সেই জ্ঞান হতে ভিন্ন হয় না। নীলাদি বিষয় নীলজ্ঞানের দ্বারা জ্ঞেয়। সুতরাং নীল ও নীলজ্ঞান অভিন্ন। (৩) জ্ঞান ও জ্ঞেয় বিষয় নিত্য সম্বন্ধযুক্ত বলে তাদের মধ্যে অভেদ রয়েছে। জ্ঞান ও জ্ঞানের বিষয়
ভিন্ন হলে তাদের মধ্যে কোন সম্বন্ধ হত না। যে পদার্থসমূহ স্বরূপতঃ অভিন্ন, তাদেরই ব্যতিক্রমহীন সহোপলম্ভ সম্ভব। জ্ঞান ও জ্ঞেয় বিষয়ের সহোপলম্ভ নিয়ম প্রমাণ করে যে, গ্রাহকজ্ঞান ও গ্রাহ্য বিষয় অভিন্ন। সেজন্যই বলা হয়েছে- ‘সলোপলন্ত নিয়মাৎ অভেদো নীলতদ্বিয়ঃ’ অর্থাৎ একসঙ্গে সর্বদাই থাকে বলে নীল ও তার জ্ঞান অভিন্ন।
(8) বলা যেতে পারে, জ্ঞানে দেশ নিয়ম ও কাল নিয়ম থাকায় বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব অবশ্য স্বীকার্য। এর উত্তরে বিজ্ঞানবাদীরা বলেন- স্বপ্নকালীন জ্ঞানে দেশনিয়ম এবং কালনিয়ম আছে। আমরা সর্বদা সর্বত্র একই স্বপ্ন দেখি না। কিন্তু একথা সকলেই স্বীকার করবেন যে, স্বপ্নে যে সর্প আমার জ্ঞানের বিষয় হয় বাহ্য জগতে তার অস্তিত্ব নাই। জাগ্রত জীবনটাও স্বপ্নের মত। জাগ্রত অবস্থায় ঘটপটাদি যে সব বস্তু আমরা দেখি সেগুলি আদৌ বর্হিজগতে নাই। ঘটবিজ্ঞান, পটবিজ্ঞান প্রভৃতি আন্তর বিজ্ঞানগুলিই বাহ্য ঘটপটাদিরূপে প্রতিভাত হয়। সুতরাং জ্ঞানের দেশনিয়ম ও কালনিয়ম জ্ঞানাতিরিক্ত বিষয়ের সাধক হতে পারে না।
কে জানে জ্ঞাতৃ-জ্ঞেয় ভেদ কল্পিত বলে, সত্য মোদক ভক্ষনে যে ফল হয়, কল্পিত আশা মোদক ভক্ষণেও,অনুরূপ ফল হয় না কেন, এরূপ প্রশ্ন ওঠে না। প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানে-জ্ঞাতৃ-জ্ঞেয় ভেদ নাই। ব্যবহার কর্তার ব্যবহারের অনুরোধেই জ্ঞান গ্রাহ্য, গ্রাহক ইত্যাদি আকারে কল্পিত হয়। যে ব্যক্তি তিথির রোগে আক্রান্ত সে যেমন আকাশে কেশ, মাকড়সার জাল ইত্যাদি দেখে, সেরূপ অনাদি অবিদ্যা জনিত বাসনার বৈচিত্র্য বশতই জ্ঞানে-জ্ঞাতৃ-জ্ঞেয়ভেদ কল্পিত হয়।
বাহ্যবস্তুর অস্তিত্ব স্বীকার করলে তা হবে পরমানু, পরমানুর সংযোগে গঠিত অবয়বী বা পরমানুপুঞ্জ। প্রখ্যাত বৌদ্ধাচার্য বসুবন্ধু তাঁর বিজ্ঞপ্তিমাত্রতাসিদ্ধি গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, এই তিনটি বিকল্পের কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেছেন, বৈভাষিক স্বীকৃত বাহ্যবিষয়কে অবয়বী রূপে এক ও বলা যায় না। অনেক ও বলা যায় না এবং সংহত অর্থাৎ পুঞ্জীভূত বা মিলিত পরমানু সমষ্টিরূপ ও বলা যায় না। কারন পরমানুই সিদ্ধ হয় না।
বসুবন্ধুর মতে, কোন রূপেই পরমানু সিদ্ধ না হওয়ায় বিজ্ঞান থেকে ভিন্ন পরমানু নাই, সুতরাং বাহ্য বিষয় ও নাই। অর্থাৎ জ্ঞান হতে ভিন্ন জ্ঞেয় বিষয়ের অস্তিত্বই নাই।
বৈভাষিক ও সৌত্রান্তিক মতে বস্তু ক্ষনিক, জ্ঞান ও ক্ষনিক। বিজ্ঞানবাদী বলেন, জ্ঞান ও বিষয় উভয়ই ক্ষনিক হলে বিষয়ের জ্ঞান হতেই পারে না। বিষয় উৎপন্ন হয়ে জ্ঞানের বিষয় হতে পারে না। কেননা বিষয় ক্ষনিক বলে উৎপন্ন হবার পরক্ষণেই তা বিনষ্ট হয়। আবার বিষয় উৎপন্ন না হয়েই জ্ঞানের বিষয় হতে পারে না। কারণ যা উৎপন্নই হয়নি, তা অসৎ।
প্রশ্ন হতে পারে-বাহ্যবস্তুই যদি না থাকে, তাহলে সে আকারের বিজ্ঞান উৎপন্ন হয় কি করে? ঘটই যদি না থাকে, তবে ঘট বিজ্ঞান বা ঘটাকার বিজ্ঞান উৎপন্ন হয় কি করে?
বিজ্ঞানবাদী এর উত্তরে বলেন, বিভিন্ন বিজ্ঞানের উৎপত্তির জন্য বাহ্য বিষয়ের অস্তিত্ব মানার প্রয়োজন নাই। ঘটবিজ্ঞান, পটবিজ্ঞান প্রভৃতি বিজ্ঞানের কারণ হচ্ছে পূর্ব বিজ্ঞানগুলির সংস্কার। বিজ্ঞান ক্ষনিক। প্রথমক্ষনের বিজ্ঞান দ্বিতীয়ক্ষনে ধ্বংস হয় ও আর একটি বিজ্ঞান উৎপন্ন হয়। তা আবার তৃতীয়ক্ষণে ধ্বংস হয়। এইভাবে ক্ষনে ক্ষনে বিনাশশীল বিজ্ঞানের প্রবাহের সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞানের দুটি রূপ আলয়বিজ্ঞান ও প্রবৃত্তিবিজ্ঞান। আলয়বিজ্ঞান শুদ্ধ অহমাকার বিজ্ঞান। ঘট বিজ্ঞান। পট বিজ্ঞান হল প্রবৃত্তিবিজ্ঞান। আলয়বিজ্ঞান সকল ধর্মের আলয় বা আধার। জলের স্রোতের মত আলয় বিজ্ঞান ক্ষনিক। এবং নিয়ত পরিবর্তনশীল। আলয়বিজ্ঞানে সকল ধর্ম বা সংস্কার সমূহ বীজ আকারে থাকে। তাই আলয়বিজ্ঞানকে ‘মূলবিজ্ঞান’ বলে। সমুদ্রের সঙ্গে তরঙ্গের যেমন সম্বন্ধ। আলয়বিজ্ঞানের সঙ্গে অন্যান্য বিজ্ঞানের সম্বন্ধ সেরূপ। আলয়বিজ্ঞান হচ্ছে সমুদ্র এবং অন্যান্য বিজ্ঞান তরঙ্গ। সমুদ্র যেমন তরঙ্গরাশির আধার, আলয়বিজ্ঞান সেরূপ অন্যান্য বিজ্ঞানের আধার। যোগের আচরণ অর্থাৎ ধ্যান-সাধনার মাধ্যমে নিখিল বাসনার উচ্ছেদ হলে নানা আকার সৃষ্টিকারী অবিদ্যার বিনাশ ঘটে। তখন আলয়বিজ্ঞানের প্রবাহ শান্ত ও সমাহিত অবস্থা প্রাপ্ত হয় এবং বিশুদ্ধ জ্ঞানের প্রকাশ ঘটে। এই অবস্থাকে ‘মহোদয়’ বলে। এই অবস্থাই নির্বান।