
জয় শিব ওঙ্কার, জয় গঙ্গাধর।
ত্রিশূলধারী বিভু, জয় বিশ্বেশ্বর।।
সৃষ্টি-স্থিতি-লয় যার ভ্রুভঙ্গির খেলা।
চরণে প্রণাম জানাই এই সন্ধ্যাবেলা।।
নিরাকার ব্রহ্ম তুমি, জ্যোতির্ময় কায়।
পুরাণ কহিছে কথা তোমার মহিমায়।।
আদি অন্তহীন তুমি, পরম অব্যয়।
তব স্তবে ঘুচে যায় সব যম-ভয়।।
সদ্যোজাত, বামদেব, অঘোর রূপধারী।
তৎপুরুষ, ঈশান—পঞ্চমুখ অধিকারী।।
দশভুজ মেলে আছ নিখিল ভুবনে।
দীপঙ্কর নতি জানায় চরণে চরণে।।
ব্রহ্মা আর বিষ্ণু যবে বিবাদে মগন।
স্তম্ভরূপে দেখা দিলে ওগো সনাতন।।
অনন্ত সে জ্যোতি-স্তম্ভ সীমা নাই তার।
নত মস্তকে হারি মানিল সংসার।।
দক্ষযজ্ঞে সতীহারা শোকাতুর মন।
উমার তপস্যায় হলে তুষ্ট হে রাজন।।
অর্ধনারীশ্বর তুমি প্রেমের প্রতীক।
তোমারি মহিমা গাহে দশটি ও দিক।।
সমুদ্র মন্থনে উঠে বিষের জ্বালা।
কণ্ঠ করি নীল তুমি পরলে সে মালা।।
দেবকুল রক্ষা পেতে হলে বিষপায়ী।
তোমার দয়ায় আজ বিশ্ব জয়ী।।
তারকাক্ষ, কমলাক্ষ, বিদ্যুৎমালী।
অসুর নাশিলে তুমি দিয়ে করতালি।।
এক শরে ত্রিপুরাসুর করলে দহন।
অধর্ম বিনাশী তুমি দেব মহাজন।।
তাণ্ডব নৃত্যে কাঁপে পৃথিবী ও আকাশ।
ডমরুর শব্দে হয় জগতের প্রকাশ।।
প্রলয় নাচন নাচো ধ্বংসের তরে।
আবার সৃজন করো আপন করে।।
রজত গিরিনিভ দেহ, তুষার ধবল।
কৈলাস শিখরে রাজো শান্তি অবিচল।।
নন্দী-ভৃঙ্গী সাথে রহে ভূত-প্রেত দল।
ভক্তের ডাকে তুমি হও গো চঞ্চল।।
অঙ্গে মাখো চিতাভস্ম, গলায় বিষধর।
স্মশানচারী হয়েও তুমি সবার ঈশ্বর।।
ত্যাগের মুরতি তুমি, বৈরাগ্যের সার।
তোমায় চিনিতে পারে সাধ্য আছে কার?।।
সোমনাথ, মল্লিকার্জুন, মহাকালেশ্বর।
ওঙ্কারেশ্বরে তুমি পরম ঈশ্বর।।
কেদার-ভীমশঙ্কর-বৈদ্যনাথ জ্যোতি।
দ্বাদশ লিঙ্গে তব সদা স্থিতি।।
বারাণসী ধাম তব অতি প্রিয় স্থান।
মণিকর্ণিকা ঘাটে দাও মুক্তিদান।।
বিশ্বনাথ রূপে তুমি করো বসবাস।
ঘুচাও ভক্তের যত মায়া-মোহ-পাশ।।
কার্তিকেয়-গণপতির জনক তুমি হে।
সর্ব সিদ্ধিদাতা তুমি অমর দেহে।।
বিপদ-নাশক তুমি অতি দয়াবান।
দীপঙ্কর গাহে শুধু তোমারি গান।।
ভালে রাজে শশধর শুভ্র জোছনায়।
শীতল পরশ তব জগত জুড়ায়।।
জটার ভিতরে গঙ্গা কুলু কুলু বয়।
তব স্মরণে সব পাপ ভস্ম হয়।।
পরিধানে বাঘছাল, হাতে তো পিনাক।
ভীষণ মূরতি তব, অতি সে অবাক।।
ত্রিনয়ন মেলে তুমি হেরো চরাচর।
অন্তরে বিরাজো প্রভু অন্তর্যামী বর।।
আশুতোষ নাম তব অল্পে হও তুষ্ট।
তোমার প্রসাদে সব ভক্ত হয় পুষ্ট।।
রাবণ বা বাণাসুর যে দিল ডাকি।
তারেই বর দিলে তুমি কিছু নাহি রাখি।।
কালের ও কাল তুমি মহাকাল দেব।
মৃত্যুঞ্জয় রূপ তব করি মোরা সেবা।।
ভয়ংকর মূরতি ধরো দুষ্টের দমনে।
শান্ত রূপ ধরা দাও সাধক-জীবনে।।
অকিঞ্চন সেজে তুমি শ্মশানেতে থাকো।
সোনার এ লঙ্কা তুমি অপরে বিলাইয়া রাখো।।
রিক্ত হস্ত তব দাতা শিরোমণি।
তব পদরেণু মোদের মস্তকের মণি।।
ধ্যানে মগ্ন থাকো তুমি অচল অটল।
যোগীরা তোমারে খুঁজে হয় যে পাগল।।
হৃদয় কন্দরে যার তব অধিষ্ঠান।
সেই তো জনম মরণ পায় পরিত্রাণ।।
এক বিল্বপত্রে তুষ্ট ভোলানাথ দাতা।
ধুতুরা-আকন্দ তব অতি প্রিয় লতা।।
গঙ্গাজলে স্নান করি যে জন ভজে।
সে জন নিশ্চয় তব প্রেমসুধায় মজে।।
প্রকৃতি ও পুরুষ তুমি একই সাথে।
ব্রহ্মাণ্ডের চাবিকাঠি তব রাঙা হাতে।।
অণুর ভিতরে আছ, আছ ব্রহ্মাণ্ডে।
তোমারি মহিমা রাজে খণ্ডে অখণ্ডে।।
রুদ্রের একাদাশ অবতার মহাবীর।
ভক্ত হিয়া জাগাও তুমি হয়ে অতি ধীর।।
রামভক্ত হনুমান শিবেরই তো রূপ।
জ্বালো হৃদয়ে তব জ্ঞানেরই ধূপ।।
অতীত ও বর্তমান ভবিষ্যৎ তুমি।
মহা শূন্যময় এই জগত ভূমিও তুমি।।
কালচক্র ঘোরে তব অঙ্গুলি হেলনে।
স্থান দাও আমায় তব চরণ কমলে।।
দীনহীন জনারে তুমি করো হে উদ্ধার।
করুণার সিন্ধু তুমি ওগো চমৎকার।।
দীপঙ্কর বলে প্রভু তুমি মোর সব।
তব চরণেতে করি ভক্তি অনুভব।।
জীবাত্মা মাঝে তুমি শিব হয়ে রাজো।
অজ্ঞানের অন্ধকারে দীপ হয়ে সাজো।।
সোহহং মন্ত্রে তুমি পরম আশ্রয়।
তোমায় পাইলে আর কিছু নাহি ভয়।।
শিব পুরাণ পাঠে ঘুচে ভববন্ধন।
পবিত্র হয় মন, তুষ্ট ত্রিলোচন।।
ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ লাভ হয় তার।
শিব পদে মতি যার, কিসের ভয় তার?।।
জলে আছ, স্থলে আছ, আছ অনলে।
আছ তুমি এই বিশ্বের সকল সমদলে।।
বৃক্ষে আছ, পত্রে আছ, আছ পুষ্পের ঘ্রাণে।
ভক্তি হয়ে জেগে ওঠো ভক্তের প্রাণে।।
ফাল্গুনের কৃষ্ণপক্ষে শিবরাত্রি আসে।
উপবাসী ভক্তগণ তব ভালোবাসে।।
জাগরণ করি তারা নাম জপে সার।
খুলে দাও তাদের তরে মোক্ষ-দুয়ার।।
মোর বুদ্ধি মোর দেহ তব পদে দিই।
তোমার চরণে যেন চিরকাল রহি।।
ভালো মন্দ যা আছে মোর সঁপিলাম তোমায়।
ঠাঁই দিও ভোলানাথ তোমার করুণায়।।
দীপঙ্কর সামন্ত রচিল এই স্তোত্র।
পবিত্র হউক এর পাঠে দশ গোত্র।।
জয় শিব শম্ভু নাথ জয় মহেশ্বর।
শান্তি দাও বিশ্বমাঝে হে পরমেশ্বর।।