যে পথ ধরে নির্বান লাভ করা যায় বা দুঃখ থেকে চিরমুক্তি পাওয়া যায়, তা হল বুদ্ধের চতুর্থ আর্যসতা, দুঃখ-নিরোধ মার্গ। এ পথের নাম ‘অষ্টাঙ্গিক মার্গ’ (Eight-fold noble path) এ পথই হল মধ্যপথ-যেখানে অসংযত ভোগবিলাসিতা নেই, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কৃচ্ছসাধন নেই। এ পথে রয়েছে করুনা, মৈত্রী, সদাচার, একাগ্রতা, সংযমের চিহ্ন। বৌদ্ধ নীতিতত্ত্বের ভিত্তি হল এই অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এই আটটি মার্গ হলো-(১) সম্যক্ দৃষ্টি, (২) সম্যক্ সংকল্প, (৩) সম্যক্ বাক্, (৪) সম্যক্ কর্মান্ত, (৫) সম্যক্ আজীব, (৬) সম্যক্ ব্যায়াম, (৭) সম্যক্-স্মৃতি ও (৮) সম্যক্ সমাধি।
এই আটটি মার্গের পরিচয় নিচে দেওয়া হল:
🌏সম্যক্ দৃষ্টি (Right views): জীবনে সকল দুঃখের উৎস হল অবিদ্যা। এই অবিদ্যা থেকেই জন্ম দেয় জগৎ ও জীবন সম্পর্কে মিথ্যা জ্ঞান। এ মিথ্যা জ্ঞানকে দূর করতে গেলে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সত্যের দৃষ্টি বা সত্যের যথার্থ জ্ঞান। চারটি আর্যসত্যের প্রকৃত জ্ঞানই হল সম্যক্ দৃষ্টি।
🌏 সম্যক্ সংকল্প (Right Resolve): শুধু সত্যের জ্ঞান নয়, সে জ্ঞানের আলোকে জীবনকে নিয়ন্ত্রন করা ও কর্ম করার দৃঢ় ইচ্ছাই হল সম্যক্ সংকল্প। সুতরাং সম্যক্ দৃষ্টির কোন অর্থ নেই সম্যক্ সংকল্প ছাড়া। সেজন্য বুদ্ধদেব শিষ্যদের উপদেশ দিয়েছেন হিংসা-দ্বেষ বর্জন করতে, বিষয় বাসনা ত্যাগ করতে, ভোগবাসনা
জয় করতে।
🌏 সম্যক্ বাক্ (Right Spech): সম্যক্ সংকল্প অনুযায়ী কাজ করতে গেলে চাই বাক্ সংযম। সংকল্প শুধু দৃঢ় ইচ্ছা হলে চলবে না, সংকল্প অনুযায়ী কাজ করা চাই। মিথ্যা ভাষন, অপ্রিয় কথন, পরনিন্দা, চটুল আলাপ, কর্কশ বাক্য-বিনিময় বর্জন করা উচিত। সত্য ভাষন, প্রিয় কথন, শিষ্ঠ আলোচনা, সংযত আলাপ,মধুর বাক্য-বিনিময়ই বাক্-সংযমের লক্ষণ। যা শুভ, যা সত্য, তাই সুন্দর, তাই বক্তব্য।
🌏 সম্যক কর্মান্ত (Right Conduct): বুদ্ধদেব বলেছেন, শুধু সম্যক্ বাক্যই যথেষ্ট নয়, ন্যায় সঙ্গত আচরনের ও প্রয়োজন। বাক্ সংযমেই সংকল্প সিদ্ধি হয় না, কর্ম-নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রিয় ভাষনের সঙ্গে স্বাদহান প্রিয়কর্মের অনুশীলন করা দরকার। জীবহত্যা, চুরি করা, ইন্দ্রিয় সেবা থেকে বিরত হওয়াকেই বুদ্ধদেব সম্যক্ কর্মান্ত বলেছেন। পঞ্চশীল বা পঞ্চ আচরণ, যথা-অহিংসা, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, সত্যপালন ও মাদক বর্জনই সাম্যকর্মান্ত বা সদাচার বোঝায়।
🌏 সম্যক্ আজীব (Right Livelihood): উদ্দেশ্য ও উপায় উভয়কেই সৎভাবে রেখে জীবন যাত্রা নির্বাহ করাই হল সম্যক্ আজীব। বুদ্ধদেবের মতে, মুক্তিব্রতীকে বাসনাশূন্য হয়ে সৎকর্মের দ্বারা সৎ উপায়ে জীবিকা অর্জন করতে হবে। জীবনরক্ষার প্রয়োজনে ও অসৎ উপায় অবলম্বন করা যথার্থ নয়।
🌏 সম্যক্ ব্যায়াম (Right Effort): মুক্তিকামীর হৃদয় হবে সরোবরের মত নির্মল, আলোর মত স্বচ্ছ, ধূপের মত পবিত্র। কোন বাসনা, কোন অসৎ চিন্তা, কোন খারাপ প্রবৃত্তি তার মনের শুচিতা নষ্ট করবে না। অসৎ চিন্তাকে দূর করে সৎ চিন্তায় ভরে রাখতে হবে মনকে। মনে সৎ চিন্তায় উদয় ও স্থিতিতে স্বার্থক অধ্যবসায়ের প্রয়োজন। এই প্রযত্ন ও প্রচেষ্টাই সম্যক্ ব্যায়াম।
🌏 সম্যক্ স্মৃতি (Right Mindfulness): জীবন ক্ষনস্থায়ী। জগৎ নিত্য। সবকিছুই পরিবর্তনশীল। একদিন এ দেহ ও থাকবে না, মন ও যাবে হারিয়ে। জীবনের হাসি খেলা সব শেষ হবে। এই আমার অনেক আছে। এই আমার কিছু নেই। দেহ, মন, সংবেদন, জগৎ ও জীবন—এ সবকিছুই অনিত্য, চিরস্থায়ী নয়। বুদ্ধদেব বলেন, স্মরনের মনি কোঠায় এই সারবস্তুটুকু তুলে রাখলে জগতের প্রতি আকর্ষন কমে। পার্থিব বস্তুর প্রতি আসক্তি লোপ পায়। বন্ধন ও দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এসব তত্ত্বকথা জ্ঞানে স্মরনে মননে ধরে রাখাই হল সম্যক্ স্মৃতি।
🌏 সম্যক্ সমাধি (Right Concentration): সম্যক্ সমাধি হল অষ্টাঙ্গিক মার্গের শেষ মার্গ। এই মার্গ নির্বানের ক্ষেত্রে অপরিহার্য অঙ্গ। অন্যান্য সাতটি অঙ্গের সাধন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মন থেকে অশুভ চিন্তা, মোহ, রাগ, দ্বেষ দূরে চলে যায়। মুক্তিব্রতীর মনে সমাধির সামর্থ্য জন্ম নেয়। মনে, বনে, কোনে সাধক স্থির আসনে সমাধিতে ডুব দেবেন। একাগ্র চিত্তে মনসংযোগের নামই সমাধি।
উপরের আলোচনায় অষ্টাঙ্গিক মার্গের তাৎপর্য ভালভাবে বুঝলে লক্ষ্য করা যায় এই মার্গের প্রধান তিনটি
অঙ্গ হল :
(১) প্রজ্ঞা (Right knowledge), (২) শীল (Right Conduct), (৩) সমাধি (Right Concentration or Meditation) |
‘প্রজ্ঞা’ মানে হল সম্যক্ জ্ঞান। ‘শীল’ এর অর্থ সম্যক্ আচরণ। ‘সমাধি’ হল ধ্যান।