বিশ্বনাথের মতে অনুমিতির প্রতি পরামর্শ ব্যাপার এবং ব্যাপ্তি জ্ঞান করণ(লক্ষণ) কাজেই প্রশ্ন ওঠে পরামর্শ কি এবং এর লক্ষণ কি ? বিশ্বনাথ তার ‘ভাষা পরিচ্ছেদ:’গ্রন্থে অনুমিতির কারণ রূপে পরামর্শের লক্ষণ প্রদান করে বলেছেন—“ ব্যাপ্যস্যপক্ষ বৃত্তিত্বধী পরামর্শ উচ্যতে”ব্যাপ্তি বিশিষ্ট হেতুর পক্ষের সঙ্গে বৈশিষ্টাবগাহী যে জ্ঞান তাকে পরামর্শ বলে অর্থাৎ সাধ্যের সঙ্গে যে হেতুর ব্যাপ্তি নিশ্চয় হয়েছে,ব্যাপ্তি বিশিষ্ট সেই হেতুর পক্ষে বিদ্যমানতার জ্ঞান অনুমতিতে পরামর্শ নামে অভিহিত।যেমন,পক্ষ পর্বতের ধূম দর্শনের পর রন্ধনগৃহ প্রভৃতি স্থানে সাধ্য বহ্নিরসঙ্গে হেতু ধুমের চেয়ে ব্যক্তির পূর্বে গৃহীত হয়েছে সেই ব্যক্তির স্মরণ হয় তারপর বহ্নিরব্যাপ্তি বিশিষ্ট ধূমই এই পর্বতের দৃষ্ট হচ্ছে—এই অনুভব বা জ্ঞান জন্মায় এই জ্ঞানের নাম পরামর্শ
এই পরামর্শ দুই ভাবে অনুভূত হতে পারে—(১)পক্ষে ব্যাপ্য আছে যেমন পর্বতে বহ্নি ব্যাপ্য ধুম আছে এবং(২)পক্ষ ব্যাপ্যবান যথা—পর্ব বহ্নি ব্যাপক ধূম বান প্রথমটিতে পক্ষ(পর্বত)প্রকার বা বিশেষণ রূপে এবং হেতু( ধূম )বিশেষ্য রূপে গৃহীত দ্বিতীয় ক্ষেত্রে হেতু প্রকার রূপে এবং পক্ষ বিশেষ্য রূপে উপস্থাপিত কিন্তু এই দুই প্রকার পরামর্শ থেকে অনুমতি উৎপত্তির স্বীকার করলে যখন পক্ষ প্রকারক ব্যাপ বিশেষ্যক পরামর্শ থেকে উৎপন্ন হয় তখন ব্যাপক প্রকারকপক্ষ বিশেষ্য পরামর্শ থাকে না আবার যখন ব্যাপক প্রকারক-পক্ষ বিশেষ্য পরামর্শ থেকে অনুমতি উৎপন্ন হয় তখন পক্ষপ্রকারক ব্যাপ বিশেষক পরামর্শ না থাকার পরস্পর ব্যাভিচার বশতঃ কোন পরামর্শকে অনুমতির কারণ রূপের স্বীকার করা যায় না।
উপরিক্ত আশঙ্কার সমাধানে প্রাচীন ও নব্য নৈয়ায়িক গন দুটিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রদান করেছেন প্রাচীন নৈয়ায়িক সম্প্রদায় মনে করেন এই দুই প্রকার পরামর্শ থেকে দুই জাতীয় অনুমতি উৎপন্ন হয় পক্ষে ব্যাপ্য আছে ,যেমন পর্বতে বহ্নি ব্যাপ্য ধুম আছে এরূপ পক্ষ প্রকারক ব্যাপ্য বিশেষ্যক পরামর্শ থেকে ‘পর্বতে বহ্নি আছে’এরূপ অনুমতি হয় আর পক্ষ ব্যাপ্যবান যেমন ‘পর্বতটি বহ্নি ব্যাপ্য ধুমবান’এইরূপ ব্যাপ প্রকারক পক্ষ বিশেষক পরামর্শ থেকে ‘ পক্ষ সাধ্য বান’ এরূপ অনুমিতি হয় অতএব একপ্রকার কার্যের উপর একাধিক কারণ স্মিকারের ফলে যে ব্যতিরেক ব্যভিচারের আশঙ্কা করা হয়, এক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা নেই ভিন্ন ভিন্ন আকারের পরামর্শ থেকে ভিন্ন ভিন্ন স্বরূপের অনুমিতির উদ্ভব হয়
নব্য নৈয়ায়িক গণ আবার অন্যভাবে ব্যতিরেক ব্যভিচারের আশঙ্কা নিসরণ করেন তাদের মতে উভয় প্রকার পরামর্শ থেকেই’পক্ষসাধ্য বান’এরূপ অনুমিতি জন্মায় কারণ উভয় পরামর্শেই কারণতাবচ্ছেদক হল ব্যাপ এবং পক্ষ এই দুই এর বৈশিষ্ট্যবগাহি জ্ঞান কারণ তাবচ্ছেদক ধর্ম উভয় প্রকার পরামর্শে অভিন্ন হওয়ায়’পক্ষ সাধ্যবান’এরূপ অনুমতি উদয়ে আর ব্যভিচারের প্রশ্ন থাকে না
[মীমাংসক সম্প্রদায় পরামর্শকে অনুমিতির কারণ রূপে স্মিকার নিপ্রয়োজন বলে অভিহিত করেছেন তাদের মতানুসারে পক্ষ ধর্মতা জ্ঞান এবং ব্যক্তি সস্মরণ এই দুটির পরই অনুমিতির উৎপত্তি সম্ভব হওয়ায় ব্যাপ্যতাবচ্ছেদক প্রকারক পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞানকে ই অনুমিতির কারণ রূপের স্বীকার করতে হবে, পরামর্শ বা ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যপক্ষ ধর্মতার জ্ঞান তথা পরামর্শ স্বীকারে গৌরব দোষ ঘটে ]
একটি দৃষ্টান্তের সাহায্যে বিষয়টিকে স্পষ্ট করা যায়, পর্বতের ধূম দর্শনের পর ধূম এবং বহ্নির ব্যাপ্তি সম্পর্ক স্মরণ হয় ফলে পরবর্তী বহ্নি বিশিষ্ট এরূপ অনুমিতি উৎপন্ন হয় এক্ষেত্রে কখনোই বহ্নি ব্যাপ্য ধূম পর্বত আছে এই পরামর্শের প্রয়োজনীয়তা থাকেনা ব্যাপ্যতা বচ্ছেদক প্রকারক পক্ষধর্মতা দেন বিষয়টিকে দৃষ্টান্তের সাহায্যে ব্যাখ্যা করে বলা যায় ধূম বহ্নির ব্যাপ্য সুতরাং ধূম বহ্নির ব্যাপ্যতা আছে এবং এই ব্যাপতার অবচ্ছেদক ধূমত্ব পক্ষ পর্বতে যখন ধূম দর্শন হয় তখন ঐ ধূমে বহ্নি ব্যাপতা বিশেষণ বা প্রকার রূপে এবং ধূমত্ব ব্যাপ্যতা বচ্ছেদক রূপে প্রতিভাত হয় সুতরাং পর্বত ধূমবান এই জ্ঞানটি ব্যাপ্যতাবচ্ছেদক প্রকারক পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান রূপে গ্রাহ্য হতে পারে [মীমাংসকদের উপরোক্ত আপত্তির বিরুদ্ধে প্রতি সমালোচনা করে নৈয়ায়িকগন বলেন, বহু সময় ব্যাপ্যতা বচ্ছেদক প্রকারক পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান ছাড়া শুধু ব্যাপ্তি বিশিষ্ট পক্ষধর্মতার জ্ঞান বা ব্যাপ্যতা প্রকারক পক্ষধর্মতার জ্ঞান বা ব্যাপতা প্রকারক পক্ষধর্মতারজ্ঞান থেকে সাধ্য বহ্নির অনুমান সম্ভব হয় যেমন– একটি সাধ্যের একাধিক ব্যাপ্য থাকতে পারে দৃষ্টান্ত ধূম যেমন বহ্নি দ্বারা ব্যাপ্য আলোক ও ভস্য তেমনি বহ্নিব্যাপ্য অতএব যখন সন্দেহ হয় পর্বতে ধূম আছে না আলোক আছে তখনও কেবল বহ্নি ব্যাপ্যের জ্ঞান থেকে অর্থাৎ পর্বত বহ্নি ব্যাপ্যবান এই জ্ঞান থেকে বহ্নির অনুমিতি হয় কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপ্যতা বচ্ছেদক নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয় না বলে ব্যাপ্যতাবচ্ছেদক প্রকারক পক্ষধর্মতার জ্ঞান সম্ভব হয় না অতএব ব্যাপ্যতা প্রকারক পক্ষ ধর্মতার জ্ঞান বা ব্যাপ্তি বিশিষ্ট পক্ষ ধর্মতার জ্ঞান বা পরামর্শই অনুমিতির কারণ এরূপ স্বীকার করতে হবে
তাছাড়া ব্যাপ্যতা বচ্ছেদক প্রকারক পক্ষধর্ম তার জ্ঞানকে অনুমিতির কারণ রূপের স্বীকার করলে, যে ব্যক্তি ধূম ও বহ্নির ব্যাপ্তি জ্ঞান হয়নি তারও কোনো স্থানে ধূম দর্শনের পরে বহ্নির অনুমিতি হবে কারণ, যেখানে বহ্নির ব্যাপ্য ধূমে ধূমত্ত্ব প্রকার রূপে থাকায় ঐ ব্যক্তির ব্যাপ্যতা বচ্ছেদক প্রকারক পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান হয়েছে কিন্তু বাস্তবে ( যে ব্যক্তির ধূম ও বহ্নির ব্যাপ্য ও ব্যাপক ভাবের জ্ঞান হয়নি, তার ধূমদর্শন হলে বহ্নির অনুমিতি হয় না )
মীমাংসগণ বলতে পারেন যে শুধুমাত্র ব্যপ্যতা বচ্ছেদক প্রকারক পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞানী যথেষ্ট ,ধূমে বহ্নির ব্যাপ্যতা গৃহ্যমান হওয়া প্রয়োজন অর্থাৎ ( ব্যাপ্তি সম্পর্কটি বর্তমান জ্ঞানের বিষয় হওয়া প্রয়োজনে) কিন্তু ন্যায় সম্প্রদায় এই সমাধানের প্রসঙ্গে বলেছেনযে সেক্ষেত্রে চৈত্রের ধূমে বহ্নি ব্যাপ্তি গৃহীত হওয়ার পর মৈত্রের পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান থেকে বহ্ণির অনুমিতি প্রসঙ্গে দেখা দেয় কারণ চৈত্রের যখন’ ধূমে বহ্নির ব্যাপ্য’ এরূপ ব্যাপ্তিজ্ঞান হয় তখন ধূমে ব্যাপ্যতা বচ্ছেদক রূপে ধূমত্ত্বের জ্ঞান হয় তারপর মৈত্রের ” পর্বত ধূমবান “— এরূপ পক্ষধর্ম তার জ্ঞান উৎপন্ন হলে সেই পক্ষ ধর্মতা জ্ঞানে ব্যপ্যতা বচ্ছেদক রূপে চৈত্রের যে ধূমত্ত্ব জ্ঞান হয়েছিল সেই ধূমত্ত্ব প্রকার রূপে বিদ্যমান থাকায় মৈত্রের গৃহ্যমান ব্যাপতা বচ্ছেদক প্রকারক পক্ষধর্ম তার জ্ঞান উৎপন্ন হয় যা অনুমতি উৎপত্তির অন্যতম কারণ l
কিন্তু উপরোক্ত বক্তব্য স্বীকার করলেও আশঙ্কা ঘটে যে(সেক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাপ্যতা বচ্ছদক প্রকারক পক্ষধর্ম তার জ্ঞান থেকে বহ্নির অনুমিতি কল্পনা করতে হয় ফলে এক ব্যক্তির অনুমতির ক্ষেত্রে ব্যক্তি ভেদে অনন্দ কার্যকারণ ভাব স্বীকারের আপত্তি হয় l
অন্যদিকে যদি নেয়ামত স্বীকার করা হয় তাহলে সমবায় সম্বন্ধে উৎপন্ন ব্যাপ্তি বিশিষ্ট পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞানই সমবায় সম্বন্ধে অনুমিতির কারণ হয় এরূপ একটি কার্যককারণ ভাব স্বীকারের ফলে গৌরব দোষ ঘটে না l
মীমাংসক সম্প্রদায় উপরোক্ত গৌরব দোষ পরিহারের উদ্দেশ্যে বলতে পারেন( ব্যাপ্তি প্রকারক জ্ঞান এবং পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান ভিন্ন ভিন্ন ভাবে বা সৃতন্ত্র ভাবে অনুমিতির কারণ রূপে স্বীকৃত) অতএব[ চৈত্রের ব্যাপ্তি গ্রহ হলেও পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান না হওয়ায় অনুমতি হয় না,আবার মৈত্রের পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান হলেও ব্যাপ্তিগ্রহনা হওয়ায় অনুমিতি উৎপন্ন হয় না এইভাবে ঘটনার ব্যাখ্যা দিলেও গৌরব অপসৃত হয় না] কারণ,এই যুক্তিতেও অনুমিতির উৎপত্তিতে দুটি কার্যকারণ ভাব স্বীকার করতে হয় তাছাড়া’ ধূম বহ্নি ব্যাপ্য ‘এরূপ ব্যাপ্তি দেন এবং”পর্বত আলোকবান-এরূপ পক্ষধর্মতার জ্ঞান থেকে অনুমিতি উৎপন্ন হতে পারবে কারণ উক্ত মতে অনুমিতির দুটি কারণ ব্যাপ্তি প্রকারক জ্ঞান এবং পক্ষ ধর্মতার জ্ঞান এখানে উপস্থিত অতএব যে হেতুতে সাধ্যের ব্যাক্তি গৃহীত হয়েছে সেই হেতুরই পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান অর্থাৎ পরামর্শ সেই অনুমতির জনক বলা হয় [প্রতিবাদী বলতে পারেন এক্ষেত্রেও পক্ষ ধর্ম তার জ্ঞান এবং ব্যাপ্তি জ্ঞান এই দুটিকার্য কারণ ভাবে স্বীকারে গৌরব দোষের আশঙ্কা থাকে][কিন্তু ন্যায় সম্প্রদায় উত্তরে বলেন যে বস্তুত্থ পক্ষে (ঐ দুটি জ্ঞান থেকে উৎপন্ন তৃতীয় বিশিষ্ট জ্ঞান যে কল্পনা করা হয়(পরামর্শ)তাই অনুমতি জনক)এবং(এরূপ জ্ঞান কল্পনার ক্ষেত্রে যে গৌরব হয় তা দোষজনক নয়। কারণ কার্যকারণ ভাব নিশ্চয়ের পর যে গৌরব জ্ঞাত হয় সেই গৌরব পূর্বেকার্য কারণ ভাব নিশ্চয়ে প্রতিবন্ধকতা করতে না পারায় দোষ রূপে গণ্য নয় l
এইভাবে সংক্ষেপে অনুমিতির কারণ রূপে পরামর্শ স্বীকার প্রসঙ্গে ন্যায় সম্প্রদায় ও মীমাংসক সম্প্রদায়ের বাদানুবাদটি ব্যাখ্যাত হতে পারে l
Role of poramars’a in anumana : The Mimamsa- Nyaya debate