১. জ্ঞানই মোক্ষ লাভের একমাত্র সাধন (Jñāna is the sole means to Mokṣa)
জ্ঞান-কে মোক্ষ লাভের একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহণ করে। এটি কর্ম (যেমন যাগযজ্ঞ) অথবা উপাসনা (দেবতার ধ্যান) থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। ব্রহ্মজ্ঞানই অবিদ্যা (অজ্ঞান) দূর করে, কারণ জ্ঞান ও অজ্ঞান একে অপরের বিরোধী।
২. জ্ঞান বস্তু-তন্ত্র, পুরুষ-তন্ত্র নয় (Jñāna is determined by the object, not the person)
ভামতী মত অনুসারে, জ্ঞান হল বস্তু-তন্ত্র (Vastu-Tantra), অর্থাৎ জ্ঞানের প্রকৃতি জ্ঞানের বিষয়ের দ্বারা নির্ধারিত হয় (ব্রহ্ম যেমন, জ্ঞান তেমনই হবে)। এটি পুরুষ-তন্ত্র (Puruṣa-Tantra) বা পুরুষ-ইচ্ছাধীন নয়, যেমন কর্ম বা উপাসনা। কর্ম বা উপাসনা করা বা না করা ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে, কিন্তু জ্ঞান লাভ ইচ্ছাধীন নয়।
৩. ব্রহ্মজ্ঞান হল মানসিক বৃত্তি (Brahma-Jñāna is a Mental Mode)
বিবরণ স্কুলের বিপরীতে, ভামতী মনে করে যে উপনিষদের বাক্য থেকে উৎপন্ন হওয়া ব্রহ্মজ্ঞান হল মন বা অন্তঃকরণের একটি বৃত্তি (Vṛtti)। এই বৃত্তিটি অবিদ্যার আবরণকে ছিন্ন করে।
৪. মনই ব্রহ্মজ্ঞানের করণ (Mind is the Instrument of Brahma-Jñāna)
ভামতী মতে, শুদ্ধ ও সংস্কৃত মন (Manas) হল এই ব্রহ্মজ্ঞানরূপী বৃত্তির করণ (Karana), অর্থাৎ প্রধান সাধন। যদিও শাস্ত্র (উপনিষদ) জ্ঞান উৎপাদনে সাহায্য করে, কিন্তু মনই সরাসরি জ্ঞানের উৎপত্তি ঘটায় l
৫. ব্রহ্মজ্ঞানের ফল অবিদ্যা নিবৃত্তি (The Result of Brahma-Jñāna is the Cessation of Avidyā)
জ্ঞানের কাজ ব্রহ্মকে সৃষ্টি করা নয় (কারণ ব্রহ্ম নিত্যসিদ্ধ), বরং ব্রহ্মকে আবৃত করে রাখা অবিদ্যা (অজ্ঞান)-কে নিবৃত্তি (Nivṛtti) বা দূর করা। অবিদ্যা দূর হলেই স্বতঃসিদ্ধ ব্রহ্মের স্বরূপ প্রকাশিত হয়।
৬. শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসনের ক্রম (The Sequence of Śravaṇa, Manana, and Nididhyāsana)
ব্রহ্মজ্ঞান লাভের জন্য তিনটি প্রধান প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়:
শ্রবণ (Śravaṇa): গুরু বা আচার্যের কাছ থেকে বেদান্ত বাক্য মনোযোগ সহকারে শোনা।
মনন (Manana): যুক্তির সাহায্যে শ্রবণ করা বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্ক ও সন্দেহ দূর করা।
নিদিধ্যাসন (Nididhyāsana): নিরন্তর ও গভীর ধ্যানের মাধ্যমে নিশ্চিত জ্ঞান প্রতিষ্ঠা করা।
ভামতী মতে, শ্রবণ ও মনন জ্ঞান উৎপাদনের প্রধান সহায়ক।
৭. নিদিধ্যাসন বিধেয় নয়, ফল (Nididhyāsana is a result, not a commandable act)
ভামতী মতে, নিদিধ্যাসন হল মনন-এর একটি ফলস্বরূপ অবস্থা, যা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, এটি কোনো বিধি (Command) বা করণীয় কর্ম নয়। এটি ব্রহ্মজ্ঞানে মনকে স্থিত করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। শঙ্কর ভাষ্য-এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভামতী এই অবস্থান গ্রহণ করে।
৮. অবিদ্যার আশ্রয় জীব (The Locus of Avidyā is the Jīva)
ভামতী মতে, অবিদ্যা (Avidyā) বা অজ্ঞান-এর আশ্রয় বা কেন্দ্র হল জীব (Jīva) বা ব্যষ্টি চেতনা। জ্ঞান যখন এই জীব-আশ্রিত অবিদ্যাকে দূর করে, তখনই জীব মোক্ষ লাভ করে। ব্রহ্ম যখন এক, তখন এক জীবের জ্ঞান দ্বারা সমগ্র ব্রহ্মের অবিদ্যা দূর হয় না (যা বিবরণ মতে হয়)।
৯. ব্রহ্মজ্ঞান স্বয়ংপ্রকাশ (Brahma-Jñāna is Self-Illuminating)
যখন ব্রহ্মজ্ঞানরূপী বৃত্তি অন্তঃকরণে উৎপন্ন হয়, তখন এটি জ্ঞান-স্বরূপ ব্রহ্মের ওপর থেকে অজ্ঞানতার আবরণ সরিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ, ব্রহ্মের স্বরূপ স্বয়ংপ্রকাশ (Sva-Prakāśa) হিসেবে প্রতিভাত হয়। এই জ্ঞানে অন্য কোনো প্রমাণের প্রয়োজন হয় না।
১০. জ্ঞান ও কর্মের সমুচ্চয়বাদ খণ্ডন (Rejection of the Combination of Jñāna and Karma)
ভামতী বেদান্তের মৌলিক নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জ্ঞান ও কর্মের সমুচ্চয়বাদ (Combination of Knowledge and Action for Mokṣa) সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করে। যেহেতু জ্ঞান অজ্ঞানের বিনাশ ঘটায়, আর কর্ম অজ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাই এই দুটি একসাথে মোক্ষ লাভের কারণ হতে পারে না। জ্ঞান হল মোক্ষের একমাত্র হেতু।