যে মতবাদ বস্তুর মন নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র অস্তিত্বে বিশ্বাস করে এবং বস্তুর জ্ঞানকে প্রতিরূপের মাধ্যমে পাওয়া পরোক্ষ জ্ঞান বলে স্বীকার করে তাকে প্রতিরূপী বস্তুবাদ বলা হয়। এই মতবাদের প্রবক্তা হলেন জন লক এবং দেকার্ত। সপ্তদশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক চিন্তা এই মতবাদকে সমর্থন করেছিল বলে একে বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদও বলা হয়। প্রতিরূপী বস্তুবাদের মূল বক্তব্য:
i) জগতে অসংখ্য বস্তুর অস্তিত্ব আছে। প্রতিরূপী বস্তুবাদীরা মনে
করেন চন্দ্র, সূর্য প্রভৃতি জ্ঞেয় বস্তুর জ্ঞান নিরপেক্ষ ও মন নিরপেক্ষ স্বাধীন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে, এগুলি কোনো ব্যক্তির মনের ধারণা নয়।
ii) প্রতিরূপী বস্তুবাদ অনুসারে আমরা বস্তুকে সরাসরি জানতে
পারি না, বস্তুকে জানি ধারণার মাধ্যমে। প্রতিরূপের মাধ্যমে
বস্তুকে পরোক্ষভাবে জানা যায়। এই জন্য এই মতবাদের নাম প্রতিরূপী বস্তুবাদ।
iii) প্রতিরূপী বস্তুবাদ জ্ঞান তাত্ত্বিক দ্বৈতবাদ নামেও পরিচিত। কেননা লক বস্তুর স্বয়ং অস্তিত্ব ও তার প্রতিরূপ – এই দুটি
সত্তা স্বীকার করেন।
iv) লক মনে করেন বস্তুর গুণ দু’প্রকার মুখ্য গুণ ও গৌণ গুণ। মুখ্য গুণ হল বস্তুগত এবং গৌণ গুণ হল মনোগত বা ব্যক্তিসাপেক্ষ। সংখ্যা, আকার, বিস্তৃতি, গতি, স্থিতি হল মুখ্য গুণ আর রূপ, রস, গন্ধ প্রভৃতি হল গৌণ গুণ।
v) প্রতিরূপী বস্তুবাদ অনুসারে ধারণা বা প্রতিরূপ বস্তুর অনুরূপ হলে জ্ঞান যথার্থ হয় আর আর অনুরূপ না হলে জ্ঞান অযথার্থ হয়।
vi) যেহেতু এই মতবাদ অনুযায়ী প্রতিরূপের মাধ্যমে বস্তুকে জানে, তাই এরা অতি সহজেই ভ্রান্ত জ্ঞানের ব্যাখ্যা দিতে পারে।
vii) প্রতিরূপী বস্তুবাদ অনুযায়ী আমাদের মন একটি ক্যামেরার ফিল্মের মতো, যাতে বস্তুর প্রতিচ্ছবি পড়ে। এইজন্য প্রতিরূপী বস্তুবাদকে Copy theory বলা হয়।
সমালোচনা: প্রতিরূপী বস্তুবাদ সরল বস্তুবাদের দোষ-ত্রুটি দূর করতে পারলেও অনেক নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করেছে। সেগুলি হল
i) এই মতবাদ অনুযায়ী মন সরাসরি বস্তুকে জানে না, ধারণাকে জানে। কিন্তু বস্তুকে যদি সরাসরি জানা না যায় তাহলে বাহ্য বস্তুর সঙ্গে জ্ঞাতার সম্পর্ক কীভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে? এই মতবাদ জ্ঞাতা ও জ্ঞেয় বস্তুর মধ্যে একটা পুরু লোহার পর্দা তৈরি করেছে। তাই এই মতবাদকে দার্শনিক এয়ার ‘লৌহ যবনিকা তত্ত্ব’ বলেছেন।
ii) এই মতবাদ অনুসারে বস্তুকে সরাসরি জানা যায় না। মন সরাসরি ধারণাকে জানে। যদি বস্তুকে সরাসরি জানা না যায় তাহলে মতবাদ বাহ্য জগতের অস্তিত্ব কীভাবে প্রমাণ করবে?
iii) লকের মতে, ধারণার সঙ্গে বস্তুর মিল হলে জ্ঞান সত্য হবে আর মিল না হলে জ্ঞান মিথ্যা হবে। কিন্তু বস্তু অজ্ঞাত হলে আমরা কীভাবে জানবো ধারণার সঙ্গে বস্তুর মিল হয়েছে কি না? এই মতবাদ স্বীকার করলে জনের সত্যতা বা মিথ্যাত্ব বিচার করা সম্ভব নয়।
iv) লক মুখ্য গুণ ও গৌণ গুণের যে পার্থক্য করেছেন তা মোটেই সঙ্গত নয়, দার্শনিক বার্কলে যুক্তির সাহায্যে মুখ্যগুণ ও গৌণগুণের পার্থক্য অস্বীকার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন উভয় গুণই স্থান, কাল, পাত্র ভেদে পরিবর্তনশীল। তাই কোনো গুণই বস্তুগত নয়, সব গুণই মনোগত অর্থাৎ গৌণ গুণ।
v) প্রতিরূপী বস্তুবাদের অনিবার্য পরিণতি হল বার্কলের আত্মগত ভাববাদ। লক বলেছেন, দ্রব্যকে কখনো প্রত্যক্ষের মাধ্যমে জানা যায় না। বার্কলে বলেন, যাকে প্রত্যক্ষের মাধ্যমে জানা না যায় তাহলে তার অস্তিত্ব স্বীকার করার প্রয়োজন নেই। মন শুধু ধারণাকে প্রত্যক্ষ করতে পারে, তাই শুধু মন ও তার ধারণারই অস্তিত্ব আছে।
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় যে, প্রতিরূপী বস্তুবাদ সন্তোষজনক মতবাদ নয়। এই মতবাদ ভ্রান্ত জ্ঞানের ব্যাখ্যা দিতে পারলেও এই মতবাদের অনিবার্য পরিণতি বার্কলের আত্মগত ভাববাদ।