পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসে আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদী বা দৃষ্টিবাদী হিসাবে লক, বার্কলে ও হিউমের নাম উল্লেখ করা হয়। বেকনকে অনুসরণ করে উত্তরসূরি লক অভিজ্ঞতাবাদের একটি সুসংহত রূপ দান করেছেন। হিউম, লক, বার্কলে অভিজ্ঞতাবাদ চরম পরিণতির দিকে টেনে নিয়ে গেলেন। যদিও হিউম অভিজ্ঞতাবাদের চরম যৌক্তিক পরিণতি কী হতে পারে তা দেখিয়েছেন, তবু তাঁর অভিমত কিছুটা অসংগতিপূর্ণ। তিনি ধারণার সম্বন্ধ বিষয়ক জ্ঞানকে অভিজ্ঞতাপূর্ব বলেছেন। তাই অসংগতির জন্য হিউমকে নরমপন্থী অভিজ্ঞতাবাদী বলা হয়। হিউমের অভিজ্ঞতাবাদের প্রতিপাদ্য বিষয়গুলি হল নিম্নরূপ-
i) হিউমের মতে, আমাদের সমস্ত জ্ঞানই আসে মুদ্রণ ও ধারণা থেকে। মুদ্রণ বলতে হিউম বাহ্য ও আন্তর সংবেদনকেই বুঝেছেন। এই সংবেদন সজীব ও স্পষ্ট। এই সংবেদনেরই অস্পষ্ট ও ক্ষীণ মানসরূপ হল ধারণা। মুদ্রণ থেকেই ধারণার উৎপত্তি। যার মুদ্রণ হয় না তার ধারণাও হয় না। প্রতিটি ধারণাই হল কোনো না কোনো মুদ্রণের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। কোনো বস্তু প্রত্যক্ষ করার সময় বস্তুটির যে ছাপ মনে পড়ে তাই মুদ্রণ আর তার স্মৃতি প্রতিরূপ হল ধারণা। এইসব ছাপ বা ধারণা হল জ্ঞানের উপকরণ। এগুলি সাধারণত স্বতন্ত্র ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। এই মুদ্রণ ও ধারণাগুলি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত হয় তিনটি অনুষঙ্গের নিয়মের দ্বারা। অনুসঙ্গের নিয়মগুলি হল সান্নিধ্যের নিয়ম ও পারম্পর্যের নিয়ম। এই নিয়মগুলি সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিনিরপেক্ষ। এক কথায় জ্ঞানোৎপত্তির ব্যাপারে হিউম বুদ্ধির কোনো অবদান স্বীকার করেননি।
ii) কার্যকারণ সম্বন্ধ বিষয়ে হিউমের অভিমত হল কারণ ও কার্যের কোনো তথাকথিত অনিবার্য সম্পর্ক নেই।
অনিবার্য সম্পর্কের জ্ঞান আমরা অভিজ্ঞতায় পাই না। কার্যকারণ সম্বন্ধ হল পূর্বাপর সম্বন্ধ মাত্র। অভিজ্ঞতায় দুটি ঘটনাকে পর পর ঘটতে দেখে আমাদের মনে এক ধরনের প্রত্যাশা জন্মে। যার থেকে আমরা আশা করি একটি ঘটনা ঘটলেই অপরটিও ঘটবে।
iii) হিউম মনে করেন, যা প্রত্যক্ষের বিষয় তারই কেবল অস্তিত্ব আছে। আমরা কেবল গুণকেই প্রত্যক্ষ করি। গুণের আধার রূপে দ্রব্য প্রত্যক্ষের বিষয় নয়, তাই দ্রব্যের কোনো অস্তিত্ব নেই। দ্রব্য আমাদের মনের একটি বিমূর্ত ধারণা মাত্র। দ্রব্য বলে যদি কিছু থাকেই তবে তার জ্ঞান নিশ্চয় সংবেদন থেকে পাওয়া যাবে। সুতরাং আমরা যাকে দ্রব্য বলি তা আসলে গুণ সমষ্টি। অতীন্দ্রিয় মন বা আত্মারও কোনো অস্তিত্ব নেই। মন হল চিন্তা, ইচ্ছা বা অনুভূতির প্রবাহমাত্র – তার অতিরিক্ত কিছুই নয়।
iv) আত্মা নেই। তথাকথিত আত্মা হল চিন্তা, অনুভূতি প্রভৃতি কতকগুলি মানসিক অবস্থার ধারা। অবস্থাগুলি অনুষঙ্গ নিয়মের দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়। এদের সংযুক্ত করার জন্য আত্মার কল্পনা করার প্রয়োজন নেই।
v) হিউমের মতে, বাক্য দুই প্রকার সংশ্লেষক বাক্য ও বিশ্লেষক বাক্য। বাহ্যিক জগৎ সম্পর্কীয় বাক্যগুলি সংশ্লেষক। সংশ্লেষক বাক্য আপতিক। কারণ, বাস্তব ঘটনা সম্পর্কে আমরা সুনিশ্চিত জ্ঞান লাভ করতে পারি না। বিশ্লেষক বাক্য আবশ্যিক। এই বাক্যে ধারণার সম্বন্ধ প্রকাশ করা হয়।
vi) জাগতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করার জন্য কার্য কারণ সম্বন্ধের উল্লেখ করা হয়। বুদ্ধিবাদীরা কার্য-কারণ সম্বন্ধকে অনিবার্য সম্বন্ধ বলেন। দৃষ্টিবাদী হিউম কার্য-কারণ সম্বন্ধকে অনিবার্য সম্বন্ধ বলেন না। তিনি বলেন, দুটি ঘটনার মধ্যে কেবল পূর্বাপর সম্বন্ধ আছে।
সমালোচনা: ইন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা জ্ঞানের একমাত্র উৎস নয়, জড় দ্রব্য অস্বীকার করলে অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতার ব্যাখ্যা করা যায় না। আত্মা স্বীকার না করলে স্মৃতি, প্রত্যভিজ্ঞার ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। কার্য-কারণ সম্বন্ধকে নিয়ত সংযোগ সম্বন্ধ বললে অনেক সময় সহকার্যকে কারণ বলে ভুল হতে পারে। অভ্যাসের সাহায্যে কার্য-কারণের মধ্যে অনিবার্য সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা যায় না। আবার সব ধারণার অনুরূপ ইন্দ্রিয়জ আমরা পাই না। জ্ঞানের জন্য বুদ্ধির ভূমিকাকে উপেক্ষা করা চলে না।