‘ভাষা পরিচ্ছেদঃ’গ্রন্থে অনুমিতি খন্ডে বিশ্বনাথ পরামর্শকে অনুমিতির ব্যাপার রূপে স্বীকার করেছেন।এই পরামর্শ জ্ঞান পক্ষ ধর্মতা জ্ঞান ও পক্ষ বিষয়ক জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল।এই পক্ষধর্মটা জ্ঞান ও পক্ষ বিষয়ক জ্ঞানের অর্থ সুস্পষ্ট ভাবে জানার জন্য ‘পক্ষ’ এর লক্ষণ বর্ণনা করা হয়েছে। পক্ষতা যেখানে থাকে তাই পক্ষ।এই পক্ষ এর লক্ষণ নির্ধারণ করে ভাষা পরিচ্ছেদ গ্রন্থে বলা হয়েছে-
“সিষাধয়িষয়া শূণ্য সিদ্ধির্যএন বিদ্যতে।
স পক্ষস্তএ বৃত্তিত্ত্বজ্ঞানাদনুমিতি ভবেৎ।।90।।”
শুধুমাত্র সিষাধয়িসা বা অনুমানের দ্বারা সাধ্যসাধনের ইচ্ছাকে পক্ষতা বলা হয় না। কারণ সিষাধয়িসা না থাকিলেও অনুমতি হতে পারে।দৃষ্টান্ত স্বরূপ আকাশে মেঘ অনুমানের ইচ্ছা না থাকলেও হঠাৎ মেঘের গর্জনে শোনার পর মেঘের অনুমিতি হয়ে যায়। তদনুসারে সাধ্যের সংশয়কে পক্ষতা বলা যায় না।মেঘের গর্জনের দ্বারা হঠাৎ মেঘের অনুমিতির ক্ষেত্রে সাধ্য সংশয়ের কোনো প্রশ্ন থাকতে পারেনা। অতএব সিদ্ধির অভাবই পক্ষতা।
এক্ষেত্রে বিশেষ্যের অভাব বশত,বিশেষনের, অভাব বশত আবার কখনো কখনো বিশেষ্য বিশেষনের উভয়ের অভাব বশত পক্ষতা উৎপন্ন হতে পারে। সিষাধয়িসার ও সিদ্ধির নিম্নোক্ত ধরনের সমৃদ্ধ পক্ষতার সম্ভাব্য কারণ হতে পারে।
১.সিদ্ধি নেই—- সিষাধয়িসা আছে।
২.সিদ্ধি নেই—- সিষাধয়িসা নেই।
৩.সিষাধয়িসা আছে—- সিদ্ধি আছে।
৪.সিষাধয়িসা আছে—- সিদ্ধি নেই।
এক্ষেত্রে প্রথম ও চতুর্থ ক্ষেত্রটি অভিন্ন।কেননা যদি সিষাধয়িসা থাকে এবং সিদ্ধি না থাকে তাহলে সিষাধয়িসার অভাব রূপ বিশেষণ এবং সিন্ধিরূপ বিশেষ্য এই দুটির অভাব বশত দক্ষতা সিদ্ধ হয়।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সিষাধয়িসা ও সিদ্ধি না থাকলেও সিষাধয়িসার অভাব রূপ বিশেষণ থাকলেও সিদ্ধির রূপ বিশেষ্য না থাকায় সিদ্ধির অভাব রূপ পক্ষতা সিদ্ধ হয়।
তৃতীয় ক্ষেত্রে সিদ্ধি ও সিষাধয়িসা দুটি থাকে তাহলে সিষাধয়িসার অভাব রূপ বিশেষণের অভাব না থাকায় সিদ্ধির অভাব রূপ পক্ষতা অবাধ হয়। কিন্তু যদি সিদ্ধি থাকে এবং সিষাধয়িসা না থাকে তাহলে সিষাধয়িসার অভাব রূপ সিদ্ধির অভাব না থাকায় পক্ষতা তথা অনুমিতি হয় না।
সিষাধয়িসার বিরহ বা অভাব হল সিদ্ধির বিশেষণ। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, সিষাধয়িসা কি বাস্তবিক অনুমিতি উৎপন্ন করে? অর্থাৎ কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিষাধয়িসা অনুমিতির উৎপত্তিতে আদৌ কার্যকর হয়? বস্তুতপক্ষে অনুমিতির কারণ পরামর্শ উপস্থিত থাকলেও যদি সিদ্ধি থাকে তাহলে অনুমানের প্রবৃত্তি হয় না।অর্থাৎ সিদ্ধি অনুমিতির প্রতিবন্ধক।সিষাধয়িসা যদি এই সিদ্ধির প্রতিবন্ধকতা বিনষ্ট করে অনুমতি উৎপাদনে সক্ষম হয় তবে তা উত্তেজক রূপে গণ্য হবে। কারণ উত্তেজক তাই যা প্রতিবন্ধকের সমান কালীন হয়ে কার্য উৎপাদনে সক্ষম হয়।কিন্তু বাস্তবে সিষাধয়িসা উত্তেজক রূপে গণ্য হতে পারে না।ব্যাখ্যা করে বলা যায় পরামর্শের পর অনুমিতি রূপ সিদ্ধি হয়।তারপর কখনো কখনো অনুমিতি করার ইচ্ছা বা, সিষাধয়িসা জেগে উঠতে পারে।কিন্তু ওই সময় পরামর্শ জ্ঞান থাকেনা। কারণ উৎপন্ন বস্তু স্বউৎপত্তির দ্বিতীয় ক্ষণে বিনষ্ট হয়।অতএব সিষাধয়িসা যখন উদ্দিপিত হয় তখন পরামর্শ জ্ঞানের অস্তিত্ব না থাকায় অনুমিতির উৎপত্তি হতে পারে না। অতএব সিষাধয়িসাকে উত্তেজকে বলা যায় না।
আবার প্রথমে সিদ্ধি পরে পরামর্শ তারপর যদি সিষাধয়িসা থাকে তাহলে প্রথমে উৎপন্ন সিদ্ধি সিষাধয়িসের উৎপত্তি ক্ষণে বিনষ্ট হয়ে যাওয়ায় সিদ্ধির অভাব বশত স্বাভাবিক নিয়মে অনুমিতি সম্ভব হয়। ফলে সিষাধয়িসা কে উত্তেজক রূপে গণ্য করা যায় না।
তৃতীয়কল্পে যদি প্রথমে সিষাধয়িসার পর সিদ্ধি তারপর পরামর্শ থাকে তাহলে পরামর্শের সময় সিসাধয়িসা লোক পাওয়ায় অসৎ সিষাধয়িসার উত্তেজকত্ব কল্পনা করা বৃথা।
চতুর্থকল্পে যদি প্রথমে সিষাধয়িসার পরে পরামর্শে তারপর সিদ্ধি থাকে তাহলে সিষাধয়িসার বিনাশ বশত সিদ্ধি অনুমিতি উৎপন্ন হতে দেয় না।
পঞ্চমকল্পে প্রথমে সিদ্ধির পর সিষাধয়িসা তারপর যদি পরামর্শ থাকে তাহলে পরামর্শের সময় সিদ্ধির অভাব থাকায় প্রতিবন্ধক অভাব হেতু অনুমিতি হবে। সুতরাং অনুমিতিতে সিষাধয়িসার উপযোগিতা কোনোভাবেই গঠিত হয় না।
আরও কথা এই যে সিদ্ধি অনুমতি রূপ জ্ঞান বিশেষ এবং পরামর্শ ও অনুমিতি জনক জ্ঞান বিশেষ। জ্ঞান আত্মার গুণ এবং অনুভব গ্রাহ্য। সেই কারণে সিদ্ধির সময় বা পরামর্শের সময় সিষাধয়িসা উৎপন্ন হয় না। কারণ বিভুদ্রব্যের যুগল্পৎ বিশেষ জ্ঞানের উৎপত্তি অসিদ্ধ। সুতরাং সিদ্ধির পরক্ষনে বা পরামর্শের পরক্ষণে সিষাধয়িসা জন্মাতে পারে। কিন্তু তখন অনুমিতি সম্পাদনের প্রয়োজন থাকে না। অতএব অনুমিতি উৎপত্তিতে সিষাধয়িসা বিরহ সিদ্ধির এই বিশেষণ কল্পনাটি ব্যর্থ।
উপরোক্ত আশঙ্কার সমাধানে বলা হয়েছে যেখানে ‘বহিরব্যাপ্য ধুমবান পর্বত: বহিরমান’-এরূপ প্রত্যক্ষ বা স্থরনাত্মক জ্ঞান হয় সেখানে সিষাধয়িসা বশত কখনো কখনো অনুমানের প্রবৃত্তি দেখা যায়, এবং সেক্ষেত্রে পক্ষতা উৎপাদনের জন্য সিষাধয়িসা বিরহ সিদ্ধির বিশেষণ রূপগ্রাহ্য।কেননা অন্য স্থলে বহির সিদ্ধি প্রতিবন্ধক রূপে উপস্থিত থাকায় অনুমিতি উৎপত্তির সম্ভাবনা ব্যাহত হয়। অতএব বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে সিষাবয়িসের উত্তেজকস্ব স্বীকার্য। তবে মনে রাখা প্রয়োজন বিশেষ ক্ষেত্রে সিষাধয়িসা কে বিশেষ রূপে নির্দেশ করতে হবে। যে, কোনো সিষাবয়িসা যে কোনো বিষয়ের অনুমিতিতে উত্তেজক হবে না। যেমন বহির নিশ্চয় থাকা সত্ত্বেও অনুমানের দ্বারা বহিপ্রতিপাদনের ইচ্ছাবশত ধর্ম প্রভৃতি হেতু দ্বারা বহির অনুমিতি সিদ্ধ হওয়ার এক্ষেত্রে বহি অনুমান করার ইচ্ছা উত্তেজক রূপে গ্রাহ্য।