ভূমিকা : কারণ উল্লেখ করে কোনো ঘটনা ব্যাখ্যা দেওয়া একটা রীতি। সাধারণ মানুষ সত্যান্বেষী অর্থনীতিবিদ। বৈজ্ঞানিক প্রভৃতি সমাজের সব স্তরের মানুষ কারণ উল্লেখ করে কোনা ঘটনার ব্যাখ্যা বা কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকেন। আগুনে হাত দিলে হাত পুড়ে যায়। এই ঘটনার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে একজন সাধারণ মানুষ বলেন আগুনে হাত দেওয়া হাত পোড়ার কারণ। কেন ম্যালেরিয়া হয়েছে তার কারণ অনুসন্ধান করে একজন বৈজ্ঞানিক বলেন, মশা কামড়ানো ম্যালেরিয়ার কারণ, একজন চিকিৎসক এই রোগ নিরাময়ের জন্য কুইনাইন প্রয়োগ করেন। কিন্তু এরা কেউ কার্যকারণ নিয়ম সম্পর্কে আলোচনা করেন না। এই কাজ দার্শনিক করেন।
পদ্ধতি গ্রহণ: বিষয়বস্তুর সুসংবদ্ধ আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট পদ্ধতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিভিন্ন দার্শনিক সম্প্রদায় বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে উপাত্ত সংগ্রহ ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করেন। আমাদের অনুসৃত পদ্ধতি হল বিচার মূলক পদ্ধতি। এটি দর্শনের নিজস্ব পদ্ধতি।
পরীক্ষামূলক উপাত্ত :
ক) উপাত্ত সংগ্রহের উৎস:
i) Introduction to Logic – Irving M. Copi.
ii) An Introduction to Logic and Science method cohen and Nagel.
iii) পাশ্চাত্য দর্শন ও যুক্তিবিজ্ঞান- রমাপ্রসাদ দাস।
iv) Philosophical Analysis – John Hospers.
v) শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক শিক্ষিকা।
খ) সংগৃহিত উপাত্ত :
কারণ, কারণের স্বরূপ, কারণের লক্ষণ।
উপাত্ত বিশ্লেষণ: ক) কারণের স্বরূপ:
i) কারণ হল কার্যের পূর্বগামী ঘটনা, প্রকৃতিতে কোনো ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে ঘটে না। কোনো ঘটনা সব সময়ে একটা পূর্বগামী ঘটনাকে অনুসরণ করে ঘটে। যে পূর্বগামী ঘটনাটি অনুগামী ঘটনাটিকে ঘটায় তাকে কারণ এবং অনুগামী ঘটনাটিকে কার্য বলে। বিষপানে মৃত্যু হয়। বিষপান মৃত্যুর কারণ। ঘটনা দুটির মধ্যে পূর্বকার সম্বন্ধ আছে।
ii) কার্যকারণ সম্বন্ধের সব ক্ষেত্র পূর্বাপর সম্বন্ধের ক্ষেত্র নয়। আয়নার সামনে দাঁড়ালে প্রতিবিম্ব পড়ে। প্রথমটি দ্বিতীয়টির কারণ কিন্তু দুটির মধ্যে পূর্বকার সম্বন্ধ আছে কিনা তা বিতর্কিত বিষয়।
iii) নিছক পূর্বগামীতা কারণ নয়। তাল পড়ার ঠিক আগে তাল গাছের উপর দিয়ে একটা কাক উড়ে গেল, ঘটনা দুটির মধ্যে পূর্বাপর সম্বন্ধ ঘটবে। কিন্তু একটিকে অন্যটির কারণ বলা যাবে
না। কার্যকারণ সম্বন্ধ কেবল পূর্বাপর সম্বন্ধ নয়।
iv) কারণ ও কার্যের মধ্যে আবশ্যিক সম্বন্ধ আছে। কারণ ও কার্যের মধ্যে কেবল পূর্বাপর সম্বন্ধ আছে তা নয়, দুটির মধ্যে আবশ্যিক সম্বন্ধ আছে। কারণ না থাকলে কার্য ঘটবে না।
v) কারণ ও কার্য হল সাপেক্ষ পদ। কারণ মাত্রই কোনো কার্যের কারণ এবং কার্য মাত্রই কোনো কারণের কার্য। আবার যা একটি ঘটনার কার্য তা অন্য ঘটনার কারণ হতে পারে।
vi) কারণ শব্দটি কখনো কখনো দূরবর্তী বা পূর্ববর্তী কারণ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। ধরা যাক, A হল B এর কারণ, B হল C এর কারণ, C হল D এর কারণ, D হল E এর কারণ। এই কার্যকারণ শৃঙ্খলে E হল কার্য। E কার্যের প্রতি D হল পূর্ববর্তী বা আসন্ন
কারণ এবং A, B, C হল দূরবর্তী কারণ।
vii) কারণ শব্দটিকে কখনো কখনো শর্ত হিসাবে ব্যবহার করা হয়। যুক্তিবিদ মিল বলেন কারণ হল সদর্থক ও নঞর্থক শর্তের সমষ্টি। শর্ত তিন প্রকার – আবশ্যিক শর্ত, পর্যাপ্ত শর্ত পর্যাপ্ত আবশ্যিক শর্ত।
a) আবশ্যিক শর্তরূপে কারণ: কারণ শব্দটিকে যদি আবশ্যিক
শর্তরূপে ধরা হয় এবং এই অর্থে যদি A, B এর কারণ হয় তবে আমরা বলতে পারি যে,A না ঘটলে B ঘটবে না কিন্তু A ঘটলে B নাও ঘটতে পারে।
(A = বহ্নি, B = ধূম)
b) পর্যাপ্ত শর্তরূপে কারণ :
কারণ শব্দটিকে কখনো কখনো পর্যাপ্ত শর্তরূপে ধরা হয় এবং এই অর্থে A যদি B ঘটনার কারণ হয় তবে, A ঘটলে B ঘটে
কিন্তু A না ঘটলেও B ঘটতে পারে।
(A = বিষপান, B = মৃত্যু)
c) আবশ্যিক পর্যাপ্ত শর্তরূপে কারণ :
কখনো কখনো কারণ বলতে আবশ্যিক পর্যাপ্ত শর্ত রূপে ধরা হয় এবং এই অর্থে যদি A ঘটনা B ঘটনার কারণ হয় তবে,
A ঘটলে B ঘটবে
A না ঘটলে B ঘটবে না
(A = ভিজে জ্বালানিতে বহ্নি সংযোগ, B = ধোঁয়া)
খ) কারণের লক্ষণ :
মিলের মতে, কারণ হল কোনো ঘটনা বা কার্যের নিয়ত শর্তহীন অব্যবহিত পূর্ববর্তী ঘটনা। মিলের দেওয়া সংজ্ঞাটির ভিত্তিতে কার্ভেথ রিড কারণের দুটি দিকের উল্লেখ করেছেন। একটি গুণগত – দিক, অন্যটি পরিমাণগত দিক। তিনি বলেন, পরিমাণগত দিক থেকে কারণ ও কার্য সমপরিমাণ, গুণগত দিক থেকে কারণ হল কার্যের নিয়ত শর্তহীন, অব্যবহিত পূর্ববর্তী ঘটনা। দিক দুটি, দুটি অভিমতের সঙ্গে যুক্ত – একটি কারণ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক অভিমত, অন্যটি দার্শনিক অভিমত।
A.লক্ষণ
1.পরিমাণগত লক্ষণ
2.গুণগত লক্ষণ
i) পরিমাণগত লক্ষণ: বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে কারণ ও কার্য সমপরিমাণ। কার্য হল কারণের রূপান্তরিত অবস্থা। কারণের মধ্যে যে পরিমাণ জড়সত্তা ও শক্তি থাকে কার্যের মধ্যে ঠিক সেই পরিমাণ জড়সত্তা ও শক্তি থাকে।
লক্ষ্মণটির ভিত্তি: জড়সত্তা ও শক্তির নিত্যতা নীতি।
ii) গুণগত লক্ষণ: এই লক্ষণে কোনো ঘটনাকে কারণ বলা হবে তা বলা হয়েছে এবং নিছক আকস্মিক ঘটনা থেকে কারণকে পৃথক করা হয়েছে। এই লক্ষণ অনুসারে কারণ হল যেকোনো কার্যের পূর্ববর্তী ঘটনা। কিন্তু নিছক পূর্ববর্তী ঘটনা কারণ নয়, A হল B এর কারণ, B হল C এর কারণ, C হল D এর কারণ। D কার্যের প্রতি A বা B কারণ নয়। D এর কারণ C। অর্থাৎ কারণ হল অব্যবহিত পূর্ববর্তী ঘটনা।
যেকোনো অব্যবহিত ঘটনা কারণ নয়। যেকোনো অব্যবহিত পূর্বগামী ঘটনাকে কারণ বললে কাকতালীয় দোষ ঘটবে। এইজন্য কারণের লক্ষণে অপরিবর্তনীয় শব্দটি নিবেশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে কারণ হল অপরিবর্তনীয় অব্যবহিত পূর্বগামী ঘটনা।
যেকোনো অপরিবর্তনীয় অব্যবহিত পূর্বগামী ঘটনা কারণ নয়। এইরূপ বললে সহকার্যকে কারণ বলে ভ্রম নামক দোষ ঘটবে।
দিন ও রাত ঘটনা দুটির যেকোনো একটি অন্যটির অপরিবর্তনীয় অব্যাবহিত পূর্ববর্তী ঘটনা। তবু একটি অন্যটির কারণ নয়। এইজন্য কারণের লক্ষণে শর্তহীন শব্দটি নিবেশ করা হয়েছে। সুতরাং কারণের সম্পূর্ণ গুণগত লক্ষণটি হল – শর্তহীন
অপরিবর্তনীয় অব্যবহিত পূর্বগামী ঘটনা।
সিদ্ধান্ত: দৈনন্দিন জীবনে বা বিজ্ঞানে কারণ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। আমরা বলি রামের মৃত্যুর কারণ তার বিষপান, শ্যামের আগুনে হাত দেওয়া তার হাত পোড়ার কারণ ইত্যাদি। প্রকৃতপক্ষে কারণ শব্দটি কোনো বিশেষ কার্যের কোনো বিশেষ কারণকে নির্দেশ করে না। শব্দটি একটি সার্বিক নীতিকে নির্দেশ করে। সার্বিক নীতিটি হল – বিশ্বের প্রত্যেকটি ‘ক’ শ্রেণির ঘটনার ‘খ’ শ্রেণির শর্ত আছে, যার জন্য যখনই ‘ক’ শ্রেণির কোনো দৃষ্টান্ত ‘গ’ ঘটে তখনই ‘খ’ শ্রেণির একটি দৃষ্টান্ত ‘ঘ’ ঘটে। Hospers বিষপানে রামের মৃত্যু এই সার্বিক কার্যকারণ নিয়মের একটি দৃষ্টান্ত। প্রশ্ন হল কেন ‘ক’ ঘটলে ‘খ’ ঘটে, প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করে দুটি বিপরীত সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়েছে। একটি বুদ্ধিবাদী সম্প্রদায়, অন্যটি অভিজ্ঞতাবাদী সম্প্রদায়। বুদ্ধিবাদীরা বলেন কারণ ও কার্যের মধ্যে আবশ্যিক সমৃদ্ধ থাকার কারণ সব ক্ষেত্রে কার্যকে ঘটায়। দৃষ্টিবাদী হিউম বলেন, এই সম্বন্ধ নিছক কালিক পূর্বাপর সম্বন্ধ। অবশ্য অভিজ্ঞতাবাদী মিল বুদ্ধিবাদীদের অভিমত সমর্থন করেন। আমাদের মনে হয় মিলের অভিমত যুক্তিযুক্ত।